চট্টগ্রামে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এরই মধ্যে বর্ষা মৌসুমের শুরুতে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু। একদিকে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের চাপ, অন্যদিকে নগরজুড়ে এডিস মশার বিস্তার— সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে পরিচালিত জরিপে প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রতি চারটি বাড়ির একটিতে মিলেছে এডিসের লার্ভা। জরিপে নগরের সব ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর কাট্টলী, পাহাড়তলী, আলকরণ, পশ্চিম ও দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ বালুচরা, পাথরঘাটা এবং আন্দরকিল্লাকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জন্য হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা স্বাভাবিক ঝুঁকির মাত্রার তিন গুণেরও বেশি। একইভাবে হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ব্রেটো ইনডেক্স ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও ২৬ জুন পর্যন্ত শুধু জুন মাসেই ৮৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬৪ জনে। এর মধ্যে ১৬৭ জনই চট্টগ্রাম মহানগরের বাসিন্দা। উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের প্রকোপও উদ্বেগজনক। ২৬ জুন পর্যন্ত জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৫২৬ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৬ জন, যাদের মধ্যে ২৫৫ জনই মহানগরের শিশু। গত কয়েক মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পুরোনো ডেঙ্গু ওয়ার্ডকে ‘মিজলস ব্লক’-এ রূপান্তর করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কোনো ওয়ার্ড নেই। সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদের, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে আশঙ্কা চিকিৎসকদের।
চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীর চাপে শয্যা সংকট চরমে। পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) ১৫টি শয্যার সবগুলোতেই গুরুতর হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশুও চিকিৎসাধীন।
স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবার আগে জনসচেতনতা জরুরি। বাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, ড্রাম, টায়ার, নারিকেলের খোসাসহ যেকোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানান, জরিপের ফলাফল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদেরও ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবার চিরাচরিত রাসায়নিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিটিআই ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশক নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও মনিটরিং চলছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নগরবাসীকে নিজ নিজ বাড়ি, ছাদবাগান, এসির ট্রে ও আঙিনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।’ কোথাও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী জানান, বর্ষার পূর্ণ মৌসুমে একদিকে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী হার, অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসাব্যবস্থা সচল করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ এবং ডেঙ্গুর জন্য পুনরায় পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা না হলে আগামী দিনে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও প্রাণহানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।