‘মাদক ও কিশোর গ্যাং’ ব্যাধিতে ধুঁকছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে খুন, পুলিশের ওপর হামলা, পারিবারিক হত্যাকাণ্ড, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং জনতার হাতে অভিযুক্ত নিহত হওয়ার মতো একের পর এক ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া একাধিক আলোচিত ঘটনা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, নগর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকচক্র এবং কিশোর গ্যাং আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল ২৫ জুলাই রাতে নগরীর খুলশী আমবাগান এলাকায় দুর্ধর্ষ মাদক কারবারি আলমগীরকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলার মুখে পড়ে পুলিশ। হামলায় দুই এসআইসহ সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশের দাবি, আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে ঝর্ণাপাড়া এলাকায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একাধিক কিশোর গ্যাং পরিচালনা করে আসছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা থাকলেও জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

এ ঘটনার আগে মে মাসে একই আলমগীরের বিরুদ্ধে ঝর্ণাপাড়া এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, অস্ত্রের মহড়া এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ ওঠে। পরে স্থানীয়রা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ব্যর্থ হয়, পরে রাত ১১ টার দিকে সাড়াশি অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অন্যদিকে, আজ শনিবার (২৬ জুলাই) ইয়াবার চালান চুরির সন্দেহে কিশোর নাঈমকে তুলে নিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে কথিত মাদক কারবারি নূরুল ইসলাম ওরফে ইরানের বিরুদ্ধে। নাঈমের জানাজা শেষে উত্তেজিত জনতা ইরানকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে এবং তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনাটি মাদক কারবারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ যেমন প্রকাশ করেছে, তেমনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ভয়াবহ প্রবণতাও সামনে এনেছে।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগে পুলিশ আগে থেকেই নজরদারি করছিল। তিনি আরও জানান, নাঈম হত্যা মামলায় ইরানকে প্রধান আসামি করা হয়েছিল। তবে মামলার পরই জনতার গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়।’

এদিকে গতকাল (২৫ জুলাই) আনোয়ারা উপজেলায় মাদকাসক্ত এক যুবকের হাতে নিজ মা-বাবার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাও চট্টগ্রামবাসীকে নাড়া দিয়েছে। পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে মাদকাসক্ত ছেলে রোমি রাজ দাশগুপ্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রথমে তার মাকে হত্যা করে। মাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে বাবাকেও কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়। পুলিশ অভিযুক্তকে আটক করেছে।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত রোমি রাজ দাশগুপ্তকে আটক করে। নিহত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চমেক হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবার এখন শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি কিশোর গ্যাং, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর ঝর্ণাপাড়া, আমবাগান, সরাইপাড়া, পাহাড়তলী, বায়েজিদ, আকবরশাহসহ কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় মাদক কারবারিরা কিশোরদের ব্যবহার করে ইয়াবা বিক্রি, তথ্য আদান-প্রদান, হামলা এবং আধিপত্য বিস্তারের কাজ করাচ্ছে। এসব কিশোরের অনেকেই পরে সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে অপরাধের ধরনও দিন দিন আরও সহিংস হয়ে উঠছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র অভিযানে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহ চেইন ভাঙা, কিশোরদের অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়া রোধ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। মাদক কারবারি, কিশোর গ্যাং এবং পুলিশের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রামে একের পর এক এসব ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের এই বিস্তার কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর তা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ কত দ্রুত নেওয়া সম্ভব।